শনিবার ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

নন-লাইফ বীমায় শূন্য কমিশনের সুফল পেতে চলমান অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ জরুরি

  |   বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   2604 বার পঠিত

নন-লাইফ বীমায় শূন্য কমিশনের সুফল পেতে চলমান অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ জরুরি

দেশের নন-লাইফ বীমা শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন এবং নিয়ম-নির্দেশনা লঙ্ঘনের বোঝা বহন করে আসছে। এর ফলে খাতটির সুনাম, স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আজ প্রশ্নের মুখে। বাজারে প্রচলিত ট্যারিফ, এজেন্ট কমিশন কাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা উপেক্ষা করে কিছু বীমা কোম্পানি ও প্রভাবশালী গ্রাহকগোষ্ঠী এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রকৃত প্রিমিয়াম আয়ের বড় অংশই আর্থিক ব্যবস্থায় দৃশ্যমান থাকছে না।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ), বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কর্তৃক কমিশন শূন্য হার বা জিরো কমিশন বাস্তবায়নের উদ্যোগকে খাতসংশ্লিষ্টদের একটি বড় অংশ সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই নীতিমালা কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের বিকৃত প্রতিযোগিতা কমবে এবং বীমা শিল্পে পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে খাত বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিদ্যমান অনিয়মগুলো কার্যকরভাবে বন্ধ না করে শুধু এজেন্ট লাইসেন্স স্থগিত বা কমিশন শূন্য হার কার্যকর করা হলে অতীতের অভিজ্ঞতায় এই নীতির সফলতা নিয়ে গুরুতর সংশয় থেকে যায়। কারণ বর্তমানে বাজারে বহুমাত্রিক অনিয়ম এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, যা যেকোনো সংস্কার উদ্যোগকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনৈতিক কমিশন প্রতিযোগিতা ও গ্রাহকের সঙ্গে গোপন সমঝোতা, ডাবল সার্ভার ও বিকল্প হিসাব ব্যবস্থার ব্যবহার, ভুয়া বা অদৃশ্য ডামি কর্মকর্তা নিয়োগ এবং কাট রেট ও তথাকথিত ‘ফরেন রেট’-এর অপব্যবহার এখন নিত্যদিনের চর্চা। বিশেষ করে ‘ফরেন রেট’ নামে যে ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি আর্থিক জালিয়াতির সমতুল্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখানে একজন গ্রাহককে এমন আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে, যার প্রকৃত কমিশন হার নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বীমা প্রিমিয়ামের একটি বড় অংশ কার্যত বাজার থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশি রেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কান্ট্রি লিমিট অতিক্রম এবং সিআরসি অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অথচ বাস্তবে কিছু কোম্পানি কান্ট্রি লিমিট অতিক্রম না করেও আইসিসিসি বীমায় নির্ধারিত ৩০ পয়সা রেটের পরিবর্তে ৭ পয়সা রেটে ব্যবসা করছে। দেশীয় ট্যারিফ রেট উপেক্ষা করে কৃত্রিম ফরেন রেট ব্যবহারের এই প্রবণতাকে তারা সরাসরি ট্যারিফ লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এজেন্ট কমিশন বাতিল হলেও যদি এসব অনিয়ম অব্যাহত থাকে, তাহলে মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ কোম্পানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

তাদের মতে, আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে ফেক ক্লেইম ও গোপন হিসাবের মাধ্যমে। অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বীমা দাবির বাইরে কৃত্রিম বা ভুয়া ক্লেইম দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে কমিশন সমন্বয় করা হচ্ছে। এছাড়া, আরেকটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুযায়ী যেখানে প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার জন্য ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট তিনটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা, সেখানে কিছু কোম্পানি তিনটির বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছে।

তাদের দাবি, এই সমস্ত অনিয়ম বন্ধে প্রতি মাসে পরিশোধিত দাবির তালিকা নিয়ে ফরেনসিক অডিট বাধ্যতামূলক করা জরুরি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হলে অনিয়মকারীরা এমন কর্মকাণ্ডে জড়াতে সাহস পাবে না।

বাজারে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে যে, মোটর ইন্স্যুরেন্স খাতে নো ক্লেইম বোনাস (এনসিবি) অপব্যবহারও গুরুতর পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু কোম্পানি প্রথম বছরেই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এনসিবি দেখিয়ে সার্টিফিকেট ইস্যু করছে, যা সুস্পষ্টভাবে নিয়মবহির্ভূত। এছাড়া ডাবল সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসার বড় অংশ আইডিআরএ’র আইআইএমএস পোর্টালে প্রদর্শিত হচ্ছে না। বিস্ময়করভাবে এসব কোম্পানি ৬০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিয়ে ব্যবসা করলেও তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয় কাগজে-কলমে সীমার মধ্যেই আছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যারা অনিয়মকে ‘নিয়মে’ পরিণত করার চেষ্টা করছে এবং প্রকৃত প্রিমিয়াম কম দেখিয়ে কমিশন সমন্বয় বা লেনদেন গোপন করে ব্যবসা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইডিআরএকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্রাঞ্চ পর্যায়ে ব্যবসা আনতে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষি এখন প্রকাশ্য গোপনীয়তায় পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, “আইডিআরএ তো ১৫ শতাংশ কমিশন বন্ধ করছে, এখন থেকে বাকি ৪০–৪৫ শতাংশ দিয়ে দিবেন।” এভাবেই একটি গোপন কমিশন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা যেকোনো সংস্কার উদ্যোগকে শুরুতেই দুর্বল করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মত দিয়েছেন তারা।

এজেন্ট কমিশন বাতিল হলে সরকার রাজস্ব হারাবে—এমন যুক্তিকেও বিশেষজ্ঞরা বিভ্রান্তিকর বলে মনে করছেন। তাদের মতে, বর্তমানে এজেন্ট কমিশনের ১৫ শতাংশের বিপরীতে উৎসে কর মাত্র ৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১০০ টাকায় কর আদায় হয় মাত্র ৭৫ পয়সা। অথচ অস্বচ্ছ ব্যবস্থার কারণে প্রায় অর্ধেক প্রিমিয়ামই দৃশ্যমান নয়। পুরো প্রিমিয়াম দৃশ্যমান করা গেলে বাজারে প্রিমিয়াম আদায় ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে কোম্পানির আয় ও মুনাফা বাড়বে, ডিভিডেন্ড প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং মুনাফার ওপর ৩৭.৫ শতাংশ কর্পোরেট কর থেকে সরকার পাবে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত রাজস্ব।

তবুও প্রশ্ন উঠছে—এই উদ্যোগের বিরোধিতা কেন? খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বার্থান্বেষী একটি মহল এই সংস্কার সফল হোক তা চায় না। কারণ বৈধ ১৫ শতাংশ কমিশন কাঠামোর সুযোগ নিয়ে কিছু কোম্পানি এজেন্টের নামে বিল দেখিয়ে সেই অর্থ ইচ্ছেমতো ব্যয় করে থাকে। কমিশন শূন্য হার কার্যকর হলে এই অনিয়ন্ত্রিত অর্থপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে, যা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত হলো, কমিশন নামে যে অরাজকতা চলছে, তা বন্ধ করতে হলে প্রথমেই নন-লাইফ বীমা খাতে কমিশন প্রথা বাতিল করতে হবে। এরপর একে একে যেসব অবৈধ পথে অর্থ বের করে কমিশন সমন্বয় করা হচ্ছে, সেগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা জরুরি। বীমা শিল্পকে রক্ষা ও পুনর্গঠনের জন্য এটিকে তারা সময়ের দাবি হিসেবে দেখছেন।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বীমা শিল্প নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময়। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও নিয়মনিষ্ঠা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। কমিশন শূন্য হার নীতি হতে পারে সংস্কারের সূচনা যদি অনিয়ম দমন কার্যকর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। তবেই নন-লাইফ বীমা খাতের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বাস্তব রূপ পাবে। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেটি দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

প্রতিদিনের অর্থনীতি/এসআর
Facebook Comments Box
advertisement

Posted ৪:৪২ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫

প্রতিদিনের অর্থনীতি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

সম্পাদক:
এম এ খালেক
Contact

মাকসুম ম্যানশন (৪র্থ তলা), ১২৭, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০

০১৮৮৫৩৮৬৩৩০

E-mail: protidinerarthonity@gmail.com