
| রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 370 বার পঠিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার–১৯৭২ সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আপাতত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ ধরনের একটি মৌলিক আইনে পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়—এ কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদমর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা জোরদার, জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহির কাঠামো নির্ধারণ এবং পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো এখনই কার্যকর হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকায় এবং পরিচালনা পর্ষদ সরকার নির্ধারিত হওয়ায় নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বতন্ত্রতা সীমিত হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার–১৯৭২ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কারিগরি সহায়তায় একটি খসড়া প্রণয়ন করা হয়। পরে আইনি মতামত গ্রহণ এবং একাধিক বোর্ড সভায় আলোচনার পর গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে চার মাস পার হলেও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
খসড়ার প্রাথমিক সংস্করণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আমলাদের অন্তর্ভুক্ত না রাখার প্রস্তাব থাকলেও পরে তা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত খসড়া অনুযায়ী, পর্ষদে সরকারের একজন প্রতিনিধি, ছয়জন স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ, গভর্নর এবং একজন ডেপুটি গভর্নর থাকার কথা ছিল। দীর্ঘদিন অগ্রগতি না হওয়ায় গভর্নর সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টার কাছে চিঠি পাঠান। এর জবাবে জানানো হয়, বর্তমান সরকারের সময়ে অধ্যাদেশ জারির সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন না হওয়া হতাশাজনক। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধনী কার্যকরের চেষ্টা করা হবে।
এদিকে ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে আরও কয়েকটি আইন সংশোধনের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় থাকলেও সেগুলোর কোনোটিই এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে পর্ষদে পরিবারতন্ত্র রোধ, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে পরিবর্তন।
তবে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। আমানত বীমা আইনে সংশোধন এনে ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও বীমার আওতায় আনা হয়েছে। আমানতকারীদের বীমা সুরক্ষা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধনের খসড়া অনেক আগেই প্রস্তুত থাকলেও প্রশাসনিক ও নীতিগত আপত্তির কারণে তা থমকে আছে। বিশেষ করে পরিচালনা পর্ষদে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব কমানোর প্রস্তাব ঘিরে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁদের ধারণা, ‘পরবর্তী সরকার করবে’—এই অবস্থান সংস্কার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ারই ইঙ্গিত।

Posted ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity


