
| শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 822 বার পঠিত

বীমা খাতের উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য নতুন আইন নয়, বিদ্যমান আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) দক্ষ জনবল, স্বচ্ছতা ও তদারকির ঘাটতি কাটানো না গেলে এ খাতের বিদ্যমান সংকটও নিরসন সম্ভব নয়।
শনিবার (২২ নভেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত বীমা আইন- ২০১০ সংশোধনী শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব মন্তব্য করেন। মতবিনিময় সভার আয়োজন করে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিআইপিডির মহাসচিব কাজী মো. মোরতুজা আলী, অর্থকাগজ পত্রিকার সম্পাদক প্রণব মজুমদার ও ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান টুংকু।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইডিআরএর সাবেক সদস্য (লাইফ) সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা।
মূল প্রবন্ধে সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা বলেন, বীমা আইন–২০১০–এর ১৬০টি ধারার মধ্যে ৯৯টি ধারা অপরিবর্তিত রেখে তাদের উপধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকি ৬১টি ধারার উপধারা পরিবর্তন, সংযোজন ও বিয়োজনের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ৬৪টি নতুন ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে। তার মতে, এত বিস্তৃত সংশোধনী পর্যালোচনা করা সময়সাপেক্ষ এবং বিভিন্ন ধারায় কোম্পানি আইন, ব্যাংকিং আইনসহ একাধিক রেফারেন্স জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইডিআরএ তার নিজস্ব জনবল কাঠামো এখনো তৈরি করতে পারেনি। শুরুতে এডহক নিয়োগের তরুণ কর্মীদের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল, বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন। যেকোনো সময় বদলির কারণে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির মতো দক্ষ জনবল না থাকা সত্ত্বেও আইডিআরএর ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, দেশের বীমা খাত এখনো অনুন্নত, জনগণের বীমা সচেতনতা কম। খাতের প্রসার বাড়ানোর বদলে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে উন্নয়নের স্পষ্ট রূপরেখা নেই; বরং কর্তৃপক্ষকে আরও ক্ষমতাবান করার চেষ্টা বেশি চোখে পড়ে। এতে ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত খাতকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লা আরও বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বীমা দাবি নিষ্পত্তির ৯০ দিনের বিধান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে গ্রাহকের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, সংশোধনীতে ৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব, তফসিল-১ বাদ দেওয়া, চেয়ারম্যান–পরিচালক–সিইওসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগে আইডিআরএ অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা, পরিচালনা পর্ষদে নতুন কাঠামো—উদ্যোক্তা ৭, শেয়ারহোল্ডার ৭ ও নিরপেক্ষ পরিচালক ৭—নির্ধারণ, এবং উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডারের শেয়ার হস্তান্তরে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতার মতো বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
সভায় কাজী মো. মোরতুজা আলী বলেন, বীমা আইন সংশোধনের প্রস্তাবগুলো উন্নয়ন নয়, বরং নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক সংজ্ঞা অস্পষ্ট, যা বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন-বর্তমান বীমা খাতের যে সংকট, এই সংশোধনী তা কতটা সমাধান করতে পারবে।
তার বক্তব্যে উঠে আসে, আইডিআরএ গঠনের পর কোম্পানির সংখ্যা বাড়লেও ব্যবসা কমেছে। লাইফ বীমার গ্রাহকও এক কোটি থেকে কমে ৫০ লাখে নেমে এসেছে। অধিক নিয়ন্ত্রণ উন্নয়নকে বাধা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তিনি বলেন, নতুন করে ‘অনুসন্ধানকারী’ পদ আনা হলেও ঝুঁকি বিজ্ঞান বা রিস্ক ম্যানেজমেন্টে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরিবারের সংজ্ঞা অযথা বিস্তৃত করা হয়েছে। তদন্ত, অনুসন্ধান বা বিশেষ নিরীক্ষার পরিবর্তে আইডিআরএ নিজেই পরিচালক বা নিরপেক্ষ পরিচালক নিয়োগ করলে জবাবদিহি বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংশোধনীতে মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানকে বীমা ব্যবসার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাবকে বীমা খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেন তিনি। ইন্স্যুরটেক ও করপোরেট এজেন্টের সংজ্ঞা দেওয়া হলেও কীভাবে পরিচালিত হবে তা বলা নেই।
টপ ম্যানেজমেন্ট নিয়োগে অনুমোদনের কথা থাকলেও যোগ্যতার বিষয়ে পরিষ্কার কিছু নেই। ২০১০ সালের আইনে থাকা সত্ত্বেও পলিসিহোল্ডার ফান্ড আজও গঠিত হয়নি—সংশোধনীতে এটিকে নতুন প্রস্তাব হিসেবে আনা বোধগম্য নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ধারা ৩৯(গ)-এ ‘চেয়ারম্যান যদি যৌক্তিক মনে করেন’ শব্দচয়ন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা তৈরি করে; এখানে ‘কর্তৃপক্ষ’ হওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি। পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে নতুন পর্ষদ ব্যর্থ হলে দায় কার—এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন সংশোধন করা হলে তা ভবিষ্যৎ সংসদ বহাল রাখবে কিনা তা অনিশ্চিত। এখন দ্রুত আইন সংশোধনের প্রচেষ্টা উল্টো সংস্কার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে পারে।

Posted ৫:৩৬ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity


