
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 350 বার পঠিত

ঋণখেলাপি সংকট মোকাবিলায় নতুন করে কঠোর পদক্ষেপের দাবি তুলেছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি প্রকাশের অনুমতি দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন জানিয়েছে ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)।
বুধবার ব্যাংকগুলোর পক্ষে এবিবি এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছে। এর আগে গত ১২ নভেম্বর খেলাপি ঋণ আদায়ের কৌশল নির্ধারণে এবিবির সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে ব্যাংকারদের কাছ থেকে লিখিত সুপারিশ আহ্বান করা হয়। প্রায় আড়াই মাস পর সেই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় খেলাপিদের তালিকা প্রকাশসহ একাধিক প্রস্তাব জমা দিল সংগঠনটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ২০১৪ সালে ব্যাংক শাখা পর্যায়ে ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সে সময় ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এ উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও একই ধরনের প্রচেষ্টা নেওয়া হলে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সেগুলোও বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি ২০২১ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় এলেও সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ এবিবির মাধ্যমে আবারও বিষয়টি সামনে এলো।
খেলাপি ঋণ দ্রুত কমাতে এবিবির প্রস্তাব
খেলাপি ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে কমানোর লক্ষ্যে এবিবি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে আংশিক ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি লিয়েন করা শেয়ার দ্রুত নগদায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। মৃত্যু, মরণব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং একক মালিকানাধীন কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট প্রতিষ্ঠানের ঋণের ক্ষেত্রে সুদ মওকুফ করে দ্রুত আদায়ের লক্ষ্যে আইসিসি প্রধানের মতামত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
ঋণ পরিশোধে খেলাপিদের চাপ সৃষ্টি করতে উদ্যোগ
খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের অর্থ পরিশোধে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাংক বা আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে এবিবি। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে খেলাপিদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের আইনি অনুমোদন দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এ ছাড়া খেলাপি ব্যক্তিদের যেকোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
বন্ধকি সম্পদ বিক্রি সহজ করার সুপারিশ
বন্ধক রাখা সম্পদ নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে ঋণ আদায় সহজ করতে নিলামে বিক্রি বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সব ধরনের আয়কর ও ভ্যাট প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। নিলাম ক্রেতাদের উৎসাহিত করতে কর রেয়াত বা অন্যান্য প্রণোদনার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি নিলামে বিক্রি হওয়া সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনের শর্ত বাতিল, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পূর্ণ সহযোগিতা নিশ্চিত এবং বন্ধকদাতার অনুপস্থিতিতেও জমির খাজনা পরিশোধ ও জরিপ সম্পন্নের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। অর্থ ঋণ আদালতের রায়ে ব্যাংকের নামে হস্তান্তরিত জমির নামজারি বয়নামার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় ও বিনা খরচে সম্পন্ন করার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মামলা নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকরে গতি আনার দাবি
আইনি প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে ঋণখেলাপি এবং জামানতদাতাদের ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, সম্পদ, আয়কর রিটার্ন, পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য আদালতের অনুমতি ছাড়াই দ্রুত পাওয়ার সুযোগ চাওয়া হয়েছে। ব্যাংক বা আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করতে নির্দিষ্ট হারে ডাউন পেমেন্ট জমার শর্ত আরোপ, সিআইবি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুযোগ বন্ধ এবং স্টে-অর্ডারের ক্ষেত্রে কিস্তিভিত্তিক অর্থ পরিশোধ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও দিয়েছে এবিবি। পাশাপাশি উভয় পক্ষের শুনানি নিশ্চিত করা, বেশি খেলাপি থাকা জেলায় পৃথক অর্থ ঋণ আদালত স্থাপন এবং আটকাদেশ দ্রুত তামিলের বিষয়গুলোও সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত।
এ ছাড়া অর্থ ঋণ মামলায় ব্যক্তিগত হাজিরা ছাড়া মামলা পরিচালনার সুযোগ বাতিল এবং দেওয়ানি আটকাদেশের মেয়াদ ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে অর্থ ঋণ আইনে দ্রুত সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে।
নতুন খেলাপি ঋণ ঠেকাতে অতিরিক্ত উদ্যোগ
ভবিষ্যতে নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়া রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি জরিপকারী ও সম্পদ মূল্যায়নকারীদের তালিকা প্রকাশ, নিবন্ধক ও তহশিল অফিসে বন্ধকি সম্পদের তথ্য সহজে যাচাইয়ের ব্যবস্থা এবং সিআইবি ডাটাবেজের আদলে বন্ধকি সম্পদের আলাদা ডাটাবেজ গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে এবিবি।
ব্যাংকারদের মতে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি আসবে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে।

Posted ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity


