
| সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | 549 বার পঠিত

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বল্প সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, বাণিজ্য সহজীকরণ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং করের আওতা বিস্তারে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। এসব পদক্ষেপ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাতে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলাদা করার লক্ষ্যে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সভায় সরকারের কার্যাবলির বণ্টন ও দায়িত্বসংক্রান্ত বিধি সংশোধনের অনুমোদনের মাধ্যমে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ পৃথকভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এনবিআরের সাংগঠনিক সংস্কারে এ উদ্যোগকে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি জোরদারের ফলে কর ফাঁকি কমেছে এবং পূর্বে অনাদায়ী রাজস্ব পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহে গতি এসেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়ে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার ২২৩ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।
অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রামে আধুনিক কাস্টমস হাউস ও কাস্টমস একাডেমি নির্মাণে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থায়নে চট্টগ্রামে নতুন কর ভবন নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং শিগগিরই কাজ শুরু হবে। খুলনা কর ভবনের নির্মাণ শেষ হয়েছে, যা আগামী ২৯ জানুয়ারি উদ্বোধনের প্রস্তুতি রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় এনবিআরের জন্য ১০ বছর মেয়াদি মিডিয়াম অ্যান্ড লং টার্ম রেভিনিউ স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করা হয়েছে, যার লক্ষ্য রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা। পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে স্ট্রেংথেনিং ডোমেস্টিক রেভিনিউ মোবিলাইজেশন প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে এনবিআরের সব কার্যক্রম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর অব্যাহতির সংস্কৃতি কমাতে ট্যাক্স এক্সপেনডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করে গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে। আয়কর আইন, কাস্টমস আইন ও ভ্যাট আইন সংশোধনের মাধ্যমে কর অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এনবিআরের ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর ছাড় কার্যকর করা যাবে না।
এছাড়া আয়কর, কাস্টমস এবং ভ্যাট সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালার অথেনটিক ইংরেজি সংস্করণ সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে। এর ফলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কর আইন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন এবং আইনের প্রয়োগে দ্ব্যর্থতা কমবে বলে মনে করছে এনবিআর।
কর সচেতনতা বৃদ্ধি ও আয়কর পরিপালন সহজ করতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৩ হাজার ৫০০ জনকে ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার সনদ দেওয়া হয়েছে। এই প্রথমবার পুরো পরীক্ষাপ্রক্রিয়ায় আয়কর পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করা হয়।
আমদানি-রপ্তানি খাতে কর পরিশোধ সহজ করতে এ-চালানের মাধ্যমে অনলাইনে সরাসরি সরকারি ট্রেজারিতে শুল্ক ও কর জমার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। অ্যাসাইকিউডা ওয়ার্ল্ড ও আইবাস++ সিস্টেমের সমন্বয়ে ব্যাংক হিসাব কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কর পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিকাশ বিনা খরচে এ সুবিধা চালু করেছে এবং অন্যান্য এমএফএসের জন্যও ব্যবস্থা উন্মুক্ত রয়েছে।
বাণিজ্য সহজীকরণে অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় সভার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে এনবিআরে সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার চালু করা হয়েছে, যা কাস্টমসের ডিজিটাল অবকাঠামোকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে।
জনস্বার্থে একাধিক কর ও শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্তও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। হজযাত্রীদের বিমান টিকিটে শুল্ক অব্যাহতি, মেট্রোরেল সেবায় ভ্যাট ছাড়, রমজানে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ও অগ্রিম কর হ্রাস এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ও শুল্ক ছাড় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি নতুন যাত্রীবান্ধব ব্যাগেজ বিধিমালায় মোবাইল ফোন শুল্কমুক্ত আনার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
মোবাইল ফোনের দাম সহনীয় রাখতে আমদানি ও সংযোজন পর্যায়ে শুল্ক কমানো হয়েছে, যা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় অনলাইন নিবন্ধন, রিটার্ন, পেমেন্ট, ই-রিফান্ড ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা চালু হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫ মাসেই এক লাখ ৩১ হাজার নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। আয়কর ব্যবস্থায় ই-রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ৩৪ লাখের বেশি রিটার্ন দাখিল হয়েছে।
কাস্টমস খাতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইন্ডো চালু, বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, নতুন লাইসেন্সিং বিধিমালা এবং বন্দরে দীর্ঘদিন আটকে থাকা কনটেইনার নিলামের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে নীতিগত সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সময়ে এনবিআর রাজস্ব ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Posted ১:৫৯ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity


