মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় অর্থনীতিতে অশনিসংকেত, জ্বালানি–রপ্তানি–রেমিট্যান্সে বাড়ছে শঙ্কা

এম এ খালেক   |   মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় অর্থনীতিতে অশনিসংকেত, জ্বালানি–রপ্তানি–রেমিট্যান্সে বাড়ছে শঙ্কা
Share

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, রপ্তানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে সম্ভাব্য ধাক্কা মিলিয়ে অর্থনীতির একাধিক সূচকেই চাপ তৈরি হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে বেসরকারি দুই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাড়লে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে।

বক্তারা জানান, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হবে, যা সরাসরি উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। এতে সরকারের ভর্তুকি ও ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

অনুষ্ঠানে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত দুই দশকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় বাংলাদেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ ডিজেলের বড় অংশ পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, দেশীয়ভাবে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, যা ব্যয়বহুল। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ করলে যে খরচ পড়তো, এলএনজি আমদানিতে তার কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান সংঘাত দীর্ঘ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। অতীতে ১৯৭৩ সালের আরব–ইসরায়েল যুদ্ধ, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব কিংবা উপসাগরীয় যুদ্ধগুলোর সময় বিশ্ববাজারে তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গেছে। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে তেলের দাম ৬০–৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। যুদ্ধ ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হলে তা ১৫০ ডলার, আর দীর্ঘায়িত হলে ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়লে ভোক্তা চাহিদা কমবে, ফলে বাংলাদেশি পণ্যের অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতেও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গত অর্থবছরে ৮টি উপসাগরীয় দেশে ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও এর একটি বড় অংশ এখন ঝুঁকির মুখে।

পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আকাশপথে পণ্য পরিবহনে প্রতি কেজিতে খরচ ১০৭ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ টাকায় পৌঁছেছে। সমুদ্রপথে কনটেইনার ভাড়া ২ হাজার ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫ হাজার ৭০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা রপ্তানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে কিছুটা স্থিতি ফিরলেও তা টেকসই হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে প্রবাসী আয়েও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিনিয়োগ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সর্বশেষ হিসাবে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ নেমে এসেছে ২২ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে রাজস্ব আহরণ কমে যেতে পারে এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে আরও বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি ঋণ পাওয়া আগের মতো সহজ নাও হতে পারে।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তারা জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বাড়ানো, ব্যয় সংকোচন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

Facebook Comments Box
Share
advertisement

Posted ১:০৭ পিএম | মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬

প্রতিদিনের অর্থনীতি |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

সম্পাদক:
এম এ খালেক
Contact

মাকসুম ম্যানশন (৪র্থ তলা), ১২৭, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০

০১৮৮৫৩৮৬৩৩০

E-mail: protidinerarthonity@gmail.com