এম এ খালেক | বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট
দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা খেলাপি ঋণের বাস্তব চিত্র সামনে আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় সংসদে নতুন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য বিশ্লেষণই ইঙ্গিত দিচ্ছে—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতিগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকিং খাত আবারও স্থিতিশীল ধারায় ফিরতে পারে।
সম্প্রতি সংসদে উপস্থাপিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। পাশাপাশি বর্তমান সংসদ সদস্য ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশনার কারণে আরও ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে প্রদর্শিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দৃশ্যমান এই সংখ্যার বাইরে আরও বড় একটি ঝুঁকি আড়ালে রয়ে গেছে। আইনি জটিলতা ও নীতিগত সুবিধার কারণে বিপুল পরিমাণ ঋণ আনুষ্ঠানিক খেলাপি তালিকায় আসছে না, ফলে খাতটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র পুরোপুরি স্পষ্ট হচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ, অবলোপন এবং শ্রেণিকরণ নীতিমালায় শিথিলতা আনা হয়, যার ফলে অনেক ঋণ ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে কম ডাউন পেমেন্টে দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ নিয়ে বিপুলসংখ্যক ঋণগ্রহীতা তাদের দায় সাময়িকভাবে আড়াল করতে সক্ষম হন।
ঋণ অবলোপন নীতিমালার ক্ষেত্রেও শিথিলতা দেখা গেছে। আগে কঠোর শর্ত ও দীর্ঘ সময় পর অবলোপনের সুযোগ থাকলেও পরে তা সহজ করা হয়। এতে অনেক ঋণ মূল হিসাবের বাইরে চলে গেলেও আদায়ের বাস্তব চিত্র অপরিবর্তিত থেকেছে। একই সঙ্গে ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা বাড়ানোয় খেলাপি হিসাব শনাক্তকরণ আরও বিলম্বিত হয়েছে।
এছাড়া, একই শিল্পগোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার সুযোগ এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক প্রভাব বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোও ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, অর্থ পাচারের ঘটনাগুলো ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থার সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত এক দশকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, যার একটি বড় অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেই গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, নীতিমালার স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য ব্যাংকিং খাত সংস্কার একটি বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সময়ক্ষেপণ না করে এখনই বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং খাতটিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হয়।
Posted ২:০৪ পিএম | বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity