মুহাম্মদ নুরুল আলম চৌধুরী | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট
অ্যাকচ্যুয়ারি কী এবং বীমা শিল্পে অ্যাকচ্যুয়ারি কেন—এ প্রশ্ন অনেকেরই মনে আসে। ‘অ্যাকচ্যুয়ারি’ শব্দটি এসেছে Latin শব্দ Actuarius থেকে, যার অর্থ হিসাবরক্ষক বা তথ্য সংরক্ষণকারী। অ্যাকচ্যুয়ারি মূলত বীমা গাণিতিক বিজ্ঞান। এটি এমন একটি বিদ্যা, যেখানে প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি প্রয়োগ করে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা মূল্যায়ন করা হয়। এর মাধ্যমে কোম্পানি ও গ্রাহকের ওপর আর্থিক প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।
উইলিয়াম মরগান (এফআরএস) ছিলেন একজন ব্রিটিশ নাগরিক, যার জন্ম ২৩ মে ১৭৫০ এবং মৃত্যু ৪ মে ১৮৩৩ সালে। তিনি চিকিৎসক, পদার্থবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ ছিলেন এবং আধুনিক অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল বিজ্ঞানের জনক হিসেবে বিবেচিত। তিনি বিশ্বের প্রথম অ্যাকচ্যুয়ারি হিসেবে ১৭৭৪ সালে Equitable Life Assurance Society-এ যোগ দেন এবং সেখানে ৫৬ বছর কাজ করেন। তাঁর সময়েই বীমা তহবিলের হিসাব, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, মৃত্যুহার নির্ধারণ ও প্রিমিয়াম হিসাবের ওপর ভিত্তি করে প্রথম Actuarial Report তৈরি হয়।
মরগানের সময় জীবন বীমা ছিল একেবারেই নতুন ধারণা। মানুষের মধ্যে তখন ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা ছিল সীমিত। কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে বীমা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। বয়স, মৃত্যুহার, লাভের হার ও ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে তিনি যে মডেল তৈরি করেন, তা আজকের অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল বিজ্ঞানের ভিত্তি।
অ্যাকচ্যুয়ারি বলতে সাধারণত পেশাদার ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়, যিনি বীমা, পেনশন ও আর্থিক খাতে কাজ করেন। একজন অ্যাকচ্যুয়ারি ব্যবসায়িক বিশ্লেষক, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপকের সমন্বয়। সংক্ষেপে, তিনি এমন একজন সমস্যা সমাধানকারী, যিনি ভবিষ্যতের আর্থিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষ।
এটি অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা। অনেক ক্ষেত্রে একজন অ্যাকচ্যুয়ারির আয় একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। তবে দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে এখনো এই পেশাটি যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। দেশে বর্তমানে মাত্র দুইজন অ্যাকচ্যুয়ারি কাজ করছেন, যেখানে লাইফ ও নন-লাইফ মিলিয়ে বীমা কোম্পানির সংখ্যা ৮২টি। তুলনায় ভারতে প্রায় ৬০০, মালয়েশিয়ায় ১৬৪ এবং পাকিস্তানে ৮৮ জন অ্যাকচ্যুয়ারি রয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বীমা খাতের সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর উদ্যোগে অ্যাকচ্যুয়ারি বিষয়ে আগ্রহ কিছুটা বাড়ছে। তবুও দেশে এই পেশায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
এর অন্যতম কারণ হলো—যথাযথ মূল্যায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশমুখী হচ্ছে। অথচ অ্যাকচ্যুয়ারি ছাড়া বীমা শিল্প কার্যত অচল। প্রতিটি বীমা কোম্পানিতে যদি একজন করে অ্যাকচ্যুয়ারি থাকেন, তাহলে এই খাত আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
উন্নত দেশগুলোতে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল ডিগ্রিকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও উচ্চ আয়ের পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে তাদের বীমা খাতও টেকসইভাবে বিকশিত হয়েছে। অ্যাকচ্যুয়ারিদের কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত—জীবন বীমা, সাধারণ বীমা, পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ভবিষ্যৎ তহবিল, স্কিম মূল্যায়ন, ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইত্যাদি।
বাংলাদেশে অ্যাকচ্যুয়ারির সংকট দূর করতে যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করা হয়, তা হলো—
১) বীমা খাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ;
২) বীমা খাতে কর্মরতদের পরিবারকে এই পেশায় উদ্বুদ্ধ করা;
৩) সভা-সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি;
৪) বিদেশে অবস্থানরত দেশীয় অ্যাকচ্যুয়ারিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ;
৫) স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা;
৬) প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল বিজ্ঞান শিক্ষা চালু করা;
৭) কোম্পানিতে অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল ট্রেইনি পদ সৃষ্টি;
৮) বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)-এর ডিপ্লোমা কোর্সে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা;
৯) দেশে “বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট অব অ্যাকচ্যুয়ারি” প্রতিষ্ঠা;
১০) বিআইএ ও আইডিআরএ’র সমন্বয়ে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন।
সবশেষে বলা যায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বীমা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং গ্রাহক ও সংশ্লিষ্টদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অ্যাকচ্যুয়ারির বিকল্প নেই। অ্যাকচ্যুয়ারিয়াল বিজ্ঞানের জনক উইলিয়াম মরগানের আদর্শ অনুসরণ করে এ খাতকে এগিয়ে নেওয়াই সময়ের দাবি। তাঁর কাজই প্রমাণ করে—গণিত শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি মানুষের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
লেখক
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড
Posted ৫:১৪ পিএম | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity