প্রতিদিনের অর্থনীতি রিপোর্ট | বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট
বীমা খাতের সংস্কার কার্যক্রম কোনোভাবেই থেমে নেই; বরং তা আরও শক্তিশালী, কার্যকর ও যুগোপযোগী করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেন, পলিসিধারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করে বীমা খাতকে একটি টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানের খাতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
সংস্কার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে-এমন ধারণা নাকচ করে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বিগত সরকারের সময়ে প্রণীত বীমা আইন সংশোধন এবং ‘বীমা রেজ্যুলেশন অর্ডিন্যান্স’ বাতিল করা হয়নি। বরং এগুলোকে আরও কার্যকর, যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত করতে অর্থ মন্ত্রণালয় আইডিআরএর মতামত চেয়েছে।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় জানতে চেয়েছে বিদ্যমান আইন ও অধ্যাদেশে আরও কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে এবং সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই আইন ও অধ্যাদেশগুলো আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করা হবে। এ কারণেই বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
বীমা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়টি উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে জরুরি হলো দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি (ক্লেইম) দ্রুত পরিশোধ করা।
তিনি জানান, বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি আটকে আছে। তাই প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাতটি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেছে আইডিআরএ।
গত দুই সপ্তাহে ওই সাতটি প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করা হয়েছে। তাদের সম্পদ, বিনিয়োগ ও আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোথাও সম্পদের মূল্যায়নে সন্দেহ থাকলে নতুন করে মূল্যায়নের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্বল কোম্পানিগুলোর জমি, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, ভালো ব্যাংকে থাকা এফডিআর এবং অন্যান্য বিনিয়োগ ধাপে ধাপে নগদায়ন করা হবে। বিক্রির অর্থ প্রতিটি কোম্পানির জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় নিরীক্ষক নিয়োজিত থাকবেন। এরপর ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট (এফআইএফও)’ পদ্ধতিতে অর্থাৎ আগে যাদের দাবি জমা পড়েছে, তাদের দাবি আগে পরিশোধ করা হবে।
বীমা খাতে অতিরিক্ত কমিশন দেওয়ার প্রবণতা এখনো বন্ধ হয়নি উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বেতন বা বিভিন্ন চুক্তির আড়ালে কমিশন দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের গোপন কমিশনের প্রমাণ সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণে আইডিআরএ কাজ করছে। আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, প্রচলিত কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক-বেইজড সুপারভিশন) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যে আর্থিক প্রতিবেদন আসে, সেগুলো অনেক সময় পুরোনো হয়ে যায়। নতুন ব্যবস্থায় নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানির ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। ফলে অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
বীমা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি আইডিআরএর নজরে রয়েছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সিআইবির তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত পটভূমি আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।
অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বীমা খাতে বহু বছরের সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই প্রথম ধাপে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ এবং খাতকে স্থিতিশীল করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এরপর যেসব ক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুর্বল কোম্পানির পরিচালকদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে জরিমানা আদায়ের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যমান আইনে এমন কোনো সুযোগ নেই। ফলে বর্তমানে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি নীতিগতভাবে আলোচনায় রয়েছে।
Posted ১:৪৫ পিএম | বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity