আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী | শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট
প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে নন-লাইফ বীমার বাজারের চাহিদার তুলনায় কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি, যা সত্যিই অবাক হওয়ার মতো। এর ফলে প্রতিটি কোম্পানি টিকে থাকার জন্য কখনো কখনো অস্বাভাবিক, এমনকি অনৈতিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এতে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি গ্রাহকদের চিন্তাভাবনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং আস্থার জায়গাটি দুর্বল হয়ে যায়। তাই অন্যান্য পেশার তুলনায় বীমা পেশায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সামাজিকভাবে যথেষ্ট অবমূল্যায়ন করা হয়।
তবে বীমার গ্রাহকদের দায়িত্ব হবে, যদি তারা একটু গভীরভাবে প্রপার্টি বীমার ক্ষেত্রটি পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে দেখা যাবে যে বাস্তব পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন। বড় অঙ্কের বীমাগ্রহীতারা ট্যারিফ অনুযায়ী নির্ধারিত প্রিমিয়ামই প্রদান করে থাকেন। অর্থাৎ, নির্ধারিত মানদণ্ড ও হিসাবের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলো দক্ষতার সঙ্গে ঝুঁকি মূল্যায়ন করে এবং সেই অনুযায়ী প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে কোনো গ্রাহক তার ব্যবসার জন্য যদি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেন, তাহলে সাধারণত তিনি ঋণের দ্বিগুণ পরিমাণ সম্পদ মর্টগেজ হিসেবে জমা রাখেন। এই প্রেক্ষাপটে আমি গ্রাহকদের উদ্দেশে বলি, বীমা কেবল একটি আর্থিক পণ্য নয়; এটি একটি শক্তিশালী ব্যবসা-বাণিজ্যের হাতিয়ার। দুর্ঘটনা বা ক্ষতির মুহূর্তে গ্রাহকের স্বল্প প্রিমিয়ামে নেওয়া পলিসি অনুযায়ী সহজেই ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য বীমা কোম্পানিগুলো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ফলে ব্যবসা, অবকাঠামো বা ব্যক্তিগত সম্পদ সুরক্ষার ক্ষেত্রে বীমা স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং নন-লাইফ বীমা খাতকে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতার মাঠ হিসেবে নয়, বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক নিরাপত্তার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এখানে সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক সচেতনতাই পারে বীমা শিল্পকে স্থিতিশীল ও টেকসইভাবে বিকশিত হওয়ার পথে এগিয়ে নিতে।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বীমা খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বীমা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমিয়ে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, ফলে উদ্যোক্তারা সাহসের সঙ্গে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে এগিয়ে যেতে পারেন।
গ্রাহকদেরকে ব্যাপকভাবে বীমার আওতায় আনতে হলে বীমা পলিসি গ্রহণের ক্ষেত্রে বীমাকারীদের জন্য একটি মুক্ত অর্থনীতিভিত্তিক বাজার সৃষ্টি করা অপরিহার্য। বিশ্ব মুক্তবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশীয় বীমা পণ্যের প্রিমিয়াম হার সমন্বয় করা উচিত। অর্থাৎ, আমাদের বীমা খাতকে নন-ট্যারিফ ব্যবস্থায় প্রবর্তন করা সময়ের একান্ত দাবি।
হয়তোবা বিভিন্ন বীমা কোম্পানি সাময়িকভাবে নন-ট্যারিফের কার্যকারিতা অনুধাবনে বিলম্ব করতে পারে। আবার বর্তমানে কর্মরত অনেক বীমাবিদও আশঙ্কা করতে পারেন যে নন-ট্যারিফ চালু হলে ব্যবসার ভলিউম কমে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বাজার বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে রেট নির্ধারণ, কার্যকর ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দ্রুত ও স্বচ্ছ ক্লেইম সেটেলমেন্ট নিশ্চিত করা গেলে নন-ট্যারিফ ব্যবস্থায় ব্যবসার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। কারণ এতে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রযুক্তির আদান-প্রদানের ফলে জ্ঞানের পরিধি বাড়বে। এতে গ্রাহকের আস্থা তৈরি হবে এবং বাজারে গতিশীলতা আসবে।
বিশ্ববাজারের বীমা উপকরণ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে আমাদের জ্ঞানের পরিধি ও পেশাগত দক্ষতা আরও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে। এর ফলে দেশের বীমা শিল্প আন্তর্জাতিক মানের দিকে অগ্রসর হতে সক্ষম হবে।
এছাড়া আমাদের দৃষ্টিতে প্রতিটি বীমা কোম্পানির জন্য সলভেন্সি মার্জিন ঘোষণা বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, গ্রাহকের আস্থা সুদৃঢ় হবে এবং বীমা দাবি পরিশোধের সক্ষমতা পর্যালোচনা করা যাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বীমা শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য পুনর্বীমা বাজারকে আরও উন্মুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা অপ্রত্যাশিত ক্ষতির সময় দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক খাতকে দ্রুত স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বীমা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দীর্ঘস্থায়ী ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গঠনে বীমার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
লেখক
মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা,
বাংলাদেশ জেনারেল ইনসিওরেন্স কোম্পানী পিএলসি (বিজিআইসি)
Posted ৫:৩০ পিএম | শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬
প্রতিদিনের অর্থনীতি | Protidiner Arthonity